শিরোনাম
মাগুরায় আধুনিক শিল্পকলা ভবন হবে-কে এম খালিদ চাল,ডাল ও তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে মানববন্ধন মাগুরার জগদলে নির্বাচনী সহিঃসতায় ৪ জন নিহতের ঘঁটনায় এলাকায় শোকের মাতম, আটক চার জন মাগুরার কৃতি ফুটবলার ঝুকু না ফেরার দেশে মাগুরায় লকডাউন কার্যকরে জেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা, ত্রানের অপেক্ষায় কয়েক শত মানুষ মাগুরায় এনটিভি’র ১৮তম প্রতিষ্টা বার্ষিকীতে মাস্ক ও গাছের চারা বিতরণ মাগুরায় চোরাই ৩টি গরু উদ্ধারসহ ৮ চোর গ্রেফতার মাগুরায় নৃশংস আজিজুর হত্যার ঘাতক আশরাফের স্বীকারউক্তিতে মাথা ও পা উদ্ধার মাগুরায় করোনা সংক্রমণ রোধে শহর ও মোহাম্মদপুরে লকডাউন মাগুরায় বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্ভোধন
সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০৩:২০ পূর্বাহ্ন
add

একজন মতি মিয়া —নাজমা আক্তার

নাজমা আক্তার / ২৮০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
add

মতি মিয়া পেশায় একজন রিকশা চালক। আর নেশায় পান খোর। নিবাস দক্ষিণ অঞ্চলের গাইবান্ধার ইদিলপুর গ্রামে। বয়স ৭৮ এর কোঠায়।

সংসার জীবনে তিনি ৫ কন্যা ও ১ পুত্র সন্তানের জনক। স্ত্রী গত হয়েছে ২০১৮ সালে। মতি মিয়া সম্পর্কে এর সংক্ষিপ্ত তথ্যাদি তার মুখেই শোনা।

আমার সাথে মতি চাচার পরিচয় রাজধানী ঢাকার মিরপুর ১ অঞ্চলে। অফিস শেষে বাসায় ফেরার একমাত্র বাহন রিকশা। আর সেই রিকশার সুবাদেই মতি চাচাকে আমি চিনি।

আমি যেদিন প্রথম যাত্রী হিসেবে চাচার রিকশায় উঠি সেদিন আমাকে গন্তব্য নামিয়ে বয়স ও পরিশ্রমের ভারে হাঁপাচ্ছিলেন তিনি। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দেওয়ার সময় চাচাকে দেখে প্রচন্ড মায়া হয়েছিল।

সেদিনের করুণ অবস্থা দেখে চাচাকে প্রশ্ন করলাম “এই বয়সে রিকশা চালান কেনো? ছেলে মেয়ে কেউ নেই?

” চাচা বললেন “আমার বড় মেয়ে প্রাইমারি স্কুলের মাষ্টার, মেঝো মেয়ে গৃহিণী, সেজো মেয়ে ব্যাংকার আর ছোট দুই মেয়ে আর্মিতে চাকরি করে।

কৌতুহলে বললাম ছেলে কি করে। “সৌদি থাকে।” বললাম সবাই তো প্রতিষ্ঠিত তবুও আপনি এই বয়সে কেন রিকশা চালান?

প্রতিত্তোরে শুধুই মৃদু হাসি। ৩০ টাকা ভাড়ার বদলে ৫০ টাকা পেয়ে চাচা যেন মহা খুশি। সামান্য ২০ টাকায় কেউ এতো খুশি হয় এটা আমার অজানা ছিল।

টাকাটা হাতে নিয়ে মতি চাচা বললেন” যাক আজকে ২টো পান বেশি কিনবো, আল্লাহ তোমার ভালো করুক মা।

আমার কৌতুহল তখন সপ্তম আসমানে তাই আবারো বললাম ” আপনি কেনো রিকশা চালান বলেন তো?

চাচার উত্তরঃ মাগো তোমার চাচী মারা গেছে ৩ বছর। সে যখন বেচে ছিলো তখন সে ছেলে মেয়ে নিয়ে গ্রামে থাকতো আর আমি ঢাকায় রিকশা চালাতাম।

রিকশা চালিয়ে ছেলে মেয়েদের পড়া লেখা করিয়েছি। আল্লাহর রহমতে সবাই এখন প্রতিষ্ঠিত।

তোমার চাচী মারা যাওয়ার পর নাতিপুতি আর বৌমার সাথে গ্রামে থাকতাম। পান একটু বেশি খায় তো তাই অতিরিক্ত টাকা লাগে।

বৌমা বললো শুয়ে বসে না থেকে রিকশা চালালে তো নিজের পানের খরচ গুছিয়ে যায় তাছাড়া আপনি তো এখনো শক্তি সমত্ত মানুষ।

” কথাটায় নাকি মতি চাচা কষ্ট পায়নি বরং ভেবেছে সত্যি তো ছেলে দুর দেশে থাকে কতো কষ্ট করে উপার্জন করে। তারও তো সংসার, বউ, ছেলেমেয়ে আছে।

এই ভাবনায় চাচা নিজের এলাকায় রিকশা চালাতে শুরু করে। বৃদ্ধ বয়সে মতিচাচার রিকশা চালানো এলাকার কারোর কাছেই ভালো লাগেনি।

বিষয়টা সবাই তার ছেলে দেশে আসলে তাকে বলে। সবার কথায় ক্ষিপ্ত মতিচাচার ছেলে তাকে বলে ” বসেই তো থাকো তার উপর পান খাও বাড়তি খরচ তাই তোমাকে রিকশা চালাতে বলেছে। এতে কি মহাভারত অসুদ্ধ হয়েছে?

লোকের কাছে কথা শোনানোর জন্য অভিনয় করো এতো পারো যখন এবার যেখানে ছিলে সেখানে গিয়ে রিকশা চালাও “।

গ্রামের এক ছেলের সহায়তায় রিকশা ভাড়া নিয়ে আবারো শুরু হয় সংগ্রাম তবে সন্তান মানুষ করার নয় একটু বেচে থাকার।

আমার কৌতুহল যেন বেড়েই চললো বললাম ” আপনি চাইলে তো মেয়েদের কাছে থাকতে পারতেন।” পূর্বের মতোই মৃদুহাসি তে বললেন” ওদের ও তো স্বামী সংসার আছে, তাছাড়া ওদের ছেলে মেয়ে ইংরেজি স্কুলে পড়ে।

ওরা মাগো দামী বিল্ডিং এ থাকে। আমি রিকশাওয়ালা মানুষ ওখানে বেমানান। তাছাড়া ওদের ঘরের দেওয়ালে দামি টাইলস পানের পিক পড়লে নষ্ট হয় তাই ইচ্ছে করেই থাকিনা।

সন্তান ছোট হবে ভেবেই অনেক কথা চেপে গেলো মতি চাচা।সর্বশেষ বললেন এসব বাদ দাও মা, আল্লাহ আমাকে ভালোই রেখেছে।

“চাচার ইচ্ছে না থাকায় আমিও আর কথা বাড়ালাম না। শুধু বললাম আপনি পারলে রোজ সকালে ৯ঃ৩০ এই গেইটে দাড়াবেন আমি আপনার রিকশায় যাবো।

সেই থেকে রোজ মতি চাচার রিকশায় আমি অফিসে যাই। আজ সকালে চাচাকে গেইটের সামনে দেখতে না পেয়ে তার ফোনে কল করেছিলাম।

একজন ফোন রিসিভ করে বললো চাচা ভোর রাতে মারা গেছেন। সাথে এটাও প্রশ্ন করলো আপনি কি ওনার মেয়ে? আমি বললাম না। সে বললো আসলে আপনার নম্বর টা মা নামে সেভ করা তো তাই জিজ্ঞেস করলাম।

ফোনটা রাখতেই চোখের কোনে পানি চলো এলো। মতি চাচা যে রিকশার গ্যারেজে রাত্রি যাপন করতো সেখানে গিয়ে দেখলাম তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত ৬ সন্তানের জনক মতি মিয়ার নিথর দেহ।

কি এক মায়াময় চেহারার মতিমিয়ার লাশ তখনো বলছে আল্লাহ আমাকে ভালোই রেখেছেন,আমি ভালো আছি মা গো। মতিচাচার বিদায়ের তোড়জোড় করছে সবাই। কিন্তু সেই সবাই এর মধ্যে কোথাও তার ৬ সন্তান নেই।

মতিচাচাকে ঘিরে সমাজে অশিক্ষিত নামের কিছু রিকশাওয়ালা দের আহাজারি। চাচাকে দাফনের জন্য নিয়ে গেলো । আমিও অফিস যাচ্ছি তবে অন্য কোনো মতি মিয়ার রিকশায়। লেখাটি সম্পূর্ন সত্য ঘটনা।

বার বার একটা কথায় ভাবছি যে সন্তানদের চকলেট চিপসের আবদার মেটাতে মতিমিয়া কোন দিন কার্পন্ন করেনি সেই সন্তানরাই তার পানের আবদার মেটাতে পারেনি ।

ভাবছি রিকশা চালিয়ে ৬ সন্তানকে মানুষে রুপদান কারি মতি মিয়াকে ৬ সন্তান মিলে শেষ বয়সে একটু সস্তি দিতে পারতো না?

কেমন সমাজে বাস করছি আমরা যেখানে একজন পিতা ৬ সন্তানকে লালন পালন করতে পারে, আর ৬ সন্তান মিলে একজন পিতাকে আগলে রাখতে পারে না।

প্রকৃত মানুষ হিসেবে সন্তানদেরকে গড়ে তুলতে না পারলে, মতি চাচার মতই সমাজের অনেক পিতা কে হার মানতে হয় শেষ বয়সে।

 

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!